বিএনপির ঢাকা মহানগর কমিটি ইস্যুতে খালেদা-তারেকপন্থিদের বিরোধ চরমে

লিখেছেন editor

নিজস্ব প্রতিবেদক

হঠাৎ করে দেয়া ঢাকা মহানগর বিএনপির নতুন কমিটি নিয়ে দলের ভেতরে-বাইরে নানামুখী প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। লন্ডন থেকে দেয়া এ কমিটি করতে গিয়ে বিএনপির গঠনতন্ত্র ও গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) লঙ্ঘন করা হয়েছে। কমিটিতে ‘সংস্কারপন্থি’ নেতাদের প্রাধান্য দেয়া হলেও কিছু ত্যাগী নেতাকে বঞ্চিত করা হয়েছে। এসব কিছু নিয়ে দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে চাপা ক্ষোভ বিরাজ করছে।

ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ বিএনপির নতুন কমিটিতে শীর্ষ ৪ পদসহ বেশ ক’জন নেতাই দলটির জাতীয় নির্বাহী কমিটির বিভিন্ন পদে রয়েছেন। এর ফলে দলের গঠনতন্ত্রের এক নেতা এক পদ নীতি ভঙ্গ করা হয়েছে। ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির নতুন আহŸায়ক ও অবিভক্ত মহানগরের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আবদুস সালাম বিএনপির বর্তমান নির্বাহী কমিটিতে চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা (ভাইস চেয়ারম্যান মর্যাদায়) রয়েছেন। আর নতুন সদস্য-সচিব রফিকুল আলম মজনু বর্তমানে বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য। এ ছাড়া ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির আহŸায়ক আমান উল্লাহ আমান বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা। এ কমিটির সদস্য-সচিব আমিনুল হকও বর্তমানে বিএনপির নির্বাহী কমিটির ক্রীড়া সম্পাদক। এ ছাড়াও দুই সিটির নতুন আহŸায়ক কমিটিতে বেশ ক’জন কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য রয়েছেন।

দলীয় গঠনতন্ত্র অনুসারে বিএনপির এক নেতা দুই পদে থাকতে পারেন না। ২০১৬ সালের ১৯ মার্চ অনুষ্ঠিত বিএনপির সর্বশেষ জাতীয় কাউন্সিলে স্পষ্ট করেই সবাইকে জানিয়ে দেয়া হয় গঠনতন্ত্র অনুসারে এক নেতার দুই পদে থাকা যাবে না। এ কারণে, বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর কৃষক দলের সভাপতি ও ঠাকুরগাঁও জেলা বিএনপির সভাপতির পদ থেকে পদত্যাগ করেন। তার দেখাদেখি একাধিক পদে থাকা দলের আরও অনেক নেতা একটি পদ রেখে অন্য পদ থেকে পদত্যাগ করেন। কিন্তু এতদিন পর এসে বিএনপির নির্বাহী কমিটিতে থাকা বেশ ক’জন নেতাকে ঢাকা মহানগর নতুন কমিটিতে স্থান দেয়ায় এ নিয়ে বিএনপির ভেতরে-বাইরে ব্যাপক সমালোচনা হচ্ছে।

গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) অনুসারে রাজনৈতিক দলের কমিটিতে শতকরা ৩০ ভাগ নারী রাখার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। বিএনপিও সর্বশেষ জাতীয় কাউন্সিলের পর তাদের গঠনতন্ত্রে ২০২০ সালের মধ্যে সকল কমিটিতে ৩০ ভাগ নারী রাখার কথা সংযোজন করে ওই গঠনতন্ত্র নির্বাচন কমিশনে জমা দেয়। কিন্তু ২০২১ সালের আগস্ট মাসে এসে ঢাকা মহানগর বিএনপির উত্তর ও দক্ষিণ কমিটি করতে গিয়ে ৯৬ জনের মধ্যে মাত্র ৩ জন নারী সদস্য রাখা হয়েছে। এর মধ্যে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ আহŸায়ক কমিটিতে সদস্য হিসেবে রাখা হয়েছে সাবেক ছাত্রদলের নেতা আরিফা সুলতানা রুমা ও সাবেক সংরক্ষিত নারী আসনের কাউন্সিলর নাছরিন রশিদ পুতুলকে। আর ঢাকা মহানগর উত্তরের কমিটিতে সদস্য হিসেবে রাখা হয়েছে সাবেক কাউন্সিলর ফেরদৌস আহমেদ মিষ্টিকে।

এদিকে ঢাকা মহানগর বিএনপির উত্তর ও দক্ষিণ কমিটির আহŸায়ক যথাক্রমে আমানউল্লাহ আমান ও আবদুস সালাম সংস্কারপন্থি বিএনপি নেতা। দুই কমিটিতে আরও ক’জন সংস্কারপন্থি বিএনপি নেতা রয়েছেন। তাই সংস্কারপন্থি বিএনপি নেতাদের প্রাধান্য দিয়ে কমিটি করায় দলের ভেতর চাপা ক্ষোভ বিরাজ করছে। তবে দলে অবস্থান খর্ব হওয়ার ভয়ে কেউ প্রকাশে এ কথা বলছেন না।

বিএনপির একজন নেতা জানান, যেই সংস্কারপন্থি নেতাদের কারণে দলের আজকের এই বেহাল দশা, সেই সংস্কারপন্থি নেতাদের প্রাধান্য দেয়ার বিষয়টি অনেকেই মেনে নিতে পারছেন না। তবে কমিটি গঠনের সঙ্গে যেহেতু ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান সরাসরি জড়িত তাই মুখ ফুটে কেউ কিছু বলতে পারছেন না।

ঢাকা মহানগর কমিটিতে সংস্কারপন্থিদের স্থান দেয়া হলেও অনেক ত্যাগী ও যোগ্য নেতাকে স্থান দেয়া হয়নি। এ নিয়ে দলের ভেতর ক্ষোভ বিরাজ করছে। তবে তারাও ভবিষ্যতের আশায় কিছু বলছেন না। এমন একজন নেতা অবিভক্ত ঢাকা সিটি করপোরেশনের দুবারের নির্বাচিত ওয়ার্ড কাউন্সিলর। তিনি দীর্ঘদিন একটি থানা কমিটি ও অবিভক্ত ঢাকা মহানগর বিএনপির যুগ্ম সম্পাদক ছিলেন। তাকে এবারের কমিটিতে কোনো পদেই রাখা হয়নি। এ কারণে তিনি হতাশ ও ক্ষুব্ধ বলে জানা যায়।

গত ২ আগস্ট বিকেলে হঠাৎ করেই বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের দপ্তরের দায়িত্বে নিয়োজিত সাংগঠনিক সম্পাদক সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে ঢাকা মহানগর বিএনপির উত্তর ও দক্ষিণ কমিটি বিলুপ্ত করে নতুন কমিটি ঘোষণা করেন। লন্ডন থেকে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নির্দেশ পেয়ে তাড়াহুড়া করে কমিটি ঘোষণা করতে গিয়ে সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ কমিটির মেয়াদ কতদিন এবং কতদিন পর সম্মেলন করে পূর্ণাঙ্গ কমিটি করা হবে তার কোনো নির্দেশনা নেই। এ কারণে দলের নেতারাও বিব্রত হন।

করোনা পরিস্থিতিতে বিএনপির রাজনীতিও অফিসিয়ালি বন্ধ। তাই দলের সকল সাংগঠনিক কার্যক্রম আপাতত স্থগিত রয়েছে। জরুরি কোনো ইস্যুতে কথা বলা ও মানবিক কোনো সহায়তা কর্মসূচি ছাড়া আর কোনো কর্মকাণ্ড না করার বিষয়ে দলের নেতাকর্মীদের ওপর অফিসিয়াল আদেশও রয়েছে। এ পরিস্থিতিতে হঠাৎ কেন ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ বিএনপির আগের কমিটি ভেঙে দিয়ে তড়িঘড়ি করে নতুন কমিটি গঠন করা হলো তা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে চলছে ব্যাপক জল্পনা-কল্পনা।

ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির নতুন আহŸায়ক বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা আবদুস সালাম বলেন, দেশকে সংকটমুক্ত করতে এ কমিটি অগ্রণী ভ‚মিকা পালন করবে। স্বল্প সময়ের মধ্যে সম্মেলন করে আমরা পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন করব। সকল প্রতিবন্ধকতা কাটিয়ে আমরা দলকে এগিয়ে নেব।

ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির আহŸায়ক আমানউল্লাহ আমান বলেন, দেশের গণতন্ত্রের জন্য নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচনের কোনো বিকল্প নেই। এ কমিটি নিরপেক্ষ নির্বাচনের দাবিতে রাজপথের আন্দোলন বেগবান করবে।

You may also like

মন্তব্য করুন