সরকারের আস্থাভাজন হওয়ার দৌড়ে বিলুপ্তপ্রায় বিএনপির পেশাজীবী-ব্যবসায়ী গ্রুপ

লিখেছেন editor

নিজস্ব প্রতিবেদক

দেশের বড় দুই রাজনৈতিক দলের একটি বিএনপি এক যুগেরও বেশি সময় ক্ষমতার বাইরে। স্বাভাবিকভাবেই দলটির রাজনীতি রাজপথকেন্দ্রিক। ফলে সভা-সমাবেশসহ নানা কর্মসূচিতে ব্যয় বেড়েছে। আর এই ব্যয়ের বড় জোগানটা দিয়ে থাকেন আর্থিকভাবে সচ্ছল দলের পেশাজীবী-ব্যবসায়ী নেতারা। কিন্তু হামলা-মামলায় কোণঠাসা এসব নেতা ক্রমেই দলের রাজনীতি থেকে দূরে সরে যাচ্ছেন। নিজেদের ব্যবসার স্বার্থে অনেকে দলীয় কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ কমিয়ে দিয়েছেন। একাধিক প্রভাবশালী নেতা এরই মধ্যে দলই ত্যাগ করেছেন। আর যারা করেননি তারা ব্যস্ত সরকারের আস্থাভাজন হওয়ার দৌড়ে।

পেশাজীবী-ব্যবসায়ী নেতারা দূরে সরে যাওয়ায় বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়নে দলকে আর্থিক সংকট মোকাবিলা করতে হচ্ছে। দলের কোষাগারে অর্থের প্রভাবও কমে গেছে। নির্বাচন কমিশনে দেয়া হিসাব বিবরণী অনুযায়ী গত অর্থবছরে বিএনপির আয় আগের বছরের চেয়ে কমে গেছে। আগের বছর দলের আয় ছিল প্রায় ১০ কোটি টাকার মতো। এবার আয় হয়েছে ১ কোটি টাকারও কম। মাত্র শেষ হওয়া অর্থবছরের হিসাব এখনো নির্বাচন কমিশনে জমায় দেয়নি বিএনপিসহ কোনো রাজনৈতিক দল।

শিল্পপতি ও ব্যবসায়ী মিজানুর রহমান সিনহা বিএনপির কোষাধ্যক্ষ হিসেবে ২০১৬ সালের ১৯ মার্চ দায়িত্ব পান। গত ২২ জানুুয়ারি তিনি দায়িত্ব থেকে পদত্যাগ করেন। দলের মহাসচিবকে লেখা চিঠিতে তিনি পদত্যাগের কারণ হিসেবে বয়স ও অসুস্থতার কথা উল্লেখ করেছেন। যদিও একাধিক সূত্র বলছে, এই ব্যবসায়ী নেতা তাঁর ব্যবসা নিয়ে সরকারের পক্ষ থেকে নানামুখী চাপে আছেন। এখন বিএনপি থেকে পদত্যাগ করে কিছুটা হলেও স্বস্তিতে ব্যবসা করতে চাচ্ছেন।

বিএনপির প্রভাবশালী ব্যবসায়ী নেতাদের অন্যতম একজন ছিলেন এম মোরশেদ খান। মহাসচিব বরাবর চিঠি লিখে তিনি দল থেকে পদত্যাগ করেছেন। কারণ হিসাবে যা-ই উল্লেখ করুন না কেন, মূলত নিজের ব্যবসা টিকিয়ে রাখার স্বার্থেই তিনি দল ছেড়ে গেছেন বলে মনে করেন অন্য নেতারা।

দলটির নির্বাহী কমিটির একাধিক নেতা জানান, বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া কারামুক্ত হওয়ার পর স্থায়ী কমিটির সদস্যের বাইরে একমাত্র সাক্ষাৎ পেয়েছেন ভাইস চেয়ারম্যান পদধারী এক ব্যবসায়ী নেতা। ওই নেতাকে নেত্রীর বাড়িভাড়াসহ আনুষঙ্গিক খরচ দিতে বললে তিনি প্রায় অর্ধকোটি টাকা দেন। তবে স্থায়ী কমিটির এক সদস্য ও আরেক ভাইস চেয়ারম্যানকে এই অর্থ পরিশোধের কথা বললে তাঁরা সরকারি চাপে ব্যবসায় ধস নেমেছে উল্লেখ করে কিছু টাকা দেয়ার প্রতিশ্রæতি দেন মাত্র।

নেতারা আরো জানান, বিএনপির মুখপত্র দৈনিক দিনকাল অর্থসংকটে বেশ কয়েক বছর ধরেই খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছে। এটির প্রকাশনা অব্যাহত রাখতে দলের পক্ষ থেকে নির্ধারিত কয়েকজন ব্যবসায়ী নেতার কাছে মাসিক বরাদ্দ চাওয়া হয়েছিল। নিজেরা অর্থসংকটে থাকার কথা বলে তাঁরা অনেকেই তাতে রাজি হননি।

সূত্রগুলো বলছে, ২০১৬ সালের ১৯ মার্চ কাউন্সিলের সাড়ে চার মাস পর ৫০২ সদস্যের নির্বাহী কমিটি ঘোষণা করে বিএনপি। ওই কমিটি ঘোষণার পর উল্লেখযোগ্যসংখ্যক নেতা পদত্যাগ করেন। তাঁদের মধ্যে প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী উপদেষ্টা মোসাদ্দেক আলী ফালু, বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য আলী আসগর লবি, সাবেক সংসদ সদস্য ও পারটেক্স গ্রæপের কর্ণধার এম এ হাসেম (প্রয়াত), নির্বাহী কমিটির সদস্য মোহাম্মদ শোকরানা, সাবেক সংসদ সদস্য সালিমুল হক কামাল, সহ-অর্থবিষয়ক সম্পাদক শাহাব উদ্দিন ও ইসমাইল হোসেন বেঙ্গল (প্রয়াত) অন্যতম।

দলের ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু সম্প্রতি সাংবাদিকদের বলেছেন, ‘মোরশেদ খান বড় ব্যবসায়ী। তাঁর আরও অনেক ব্যবসা রয়েছে। রাজনীতির কারণে তা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে বিবেচনায়ই হয়তো তিনি এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। বিএনপির ব্যবসায়ী নেতাদের মধ্যে আরো যাঁরা পদত্যাগ করছেন বা দূরে থাকছেন, মুক্ত পরিবেশ পেলে তাঁরা সবাই পুনরায় সক্রিয় হবেন বলে আমি মনে করি।’

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেছেন, দলের সুসময়ে বিভিন্ন ব্যক্তিকে এমপি-মন্ত্রী হতে দেখেছি। তাঁরা আন্দোলন-সংগ্রাম করে বর্ণাঢ্য জীবন লাভ করেননি। দেশের এমন পরিস্থিতিতে তাঁদের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে যাচ্ছে। তাই তাঁদের চলে যাওয়া নিয়ে বিচলিত হওয়ার কিছু নেই।

ভাইস চেয়ারম্যান মোহাম্মদ শাহজাহান বলেন, সরকার প্রথম থেকেই বিএনপিকে নির্মূল করার চেষ্টা করছে। সে জন্য তারা বহু মামলা-মোকদ্দমা দিয়েছে। ভয়ংকর একটা নির্বাচন করার পরও তারা দেখছে যে বিএনপির কিছু করা যাচ্ছে না। এ জন্য সরকার ও তার এজেন্সিগুলো বিএনপির নেতাকর্মীদের ব্যবসার দিকে নজর দিচ্ছে। ফলে অনেকেই নিজ ব্যবসা রক্ষার স্বার্থে দলীয় কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকছেন।

You may also like

মন্তব্য করুন