পূর্ববঙ্গে সুন্নি মতবাদের প্রাধান্যের নেপথ্যে

লিখেছেন swadeshkhabar

তারিকুল ইসলাম মজুমদার

ইসলামের ৩টি মতবাদ তৎকালীন ভারতীয় উপমহাদেশে প্রবেশ করেছিল। এগুলো হলো- শিয়া, সুন্নি এবং সুফি মতবাদ। লক্ষ করলে দেখা যাবে চট্টগ্রাম অঞ্চলে সুফিবাদ তথা মাইজভান্ডারীর প্রভাব থাকলেও আমাদের পূর্ববঙ্গে আমরা প্রায় সবাই সুন্নি মতবাদে বিশ্বাসী এবং হানাফী মাজহাবের মুসলমান।

 

সুন্নি মতবাদের দলিল

১৯০১ সালে আদমশুমারি অনুযায়ী তৎকালীন বৃহত্তর ত্রিপুরায় ৭০.৫ শতাংশ ছিল মুসলমান। এর মধ্যে প্রায় সকলেই ছিলেন সুন্নি সম্প্রদায়ের এবং হানাফী মাজহাবের অনুসারী। প্রায় ২ হাজার পাঠান এবং বহু সাইয়িদ বাদে জেলার প্রায় সমস্ত মুসলমান নিজেদের শেখ বলে অভিহিত করত। তারা ছিল সকলেই সুন্নি এবং নবী (সা.)-এর অত্যন্ত কঠোর অনুসারী। অবশ্য কিছু মুসলমান নিজেদের ফরায়েজি মুসলমান বলে অভিহিত করতেন। তারা ছিলেন হাজী শরীয়তউল্লাহর অনুসারী। কিন্তু বিখ্যাত মাওলানা কেরামত আলীর ইসলাম প্রচারে ধর্মান্তরিত হন। তারা পাঁচবার প্রার্থনা করেন এবং রমজানে রোজা রাখতেন। তাদের পোশাক ছিল প্রধানত লুঙ্গি এবং মসলিনের টুপি এবং তা দ্বারা তাদেরকে হিন্দুদের থেকে আলাদা করে তোলে। [জে ই ওয়েবস্টার, ইন্ডিয়ান সিভিল সার্ভিস, ১৯১০, ইস্টার্ন বেঙ্গল ডিস্ট্রিক্ট গেজেটরস, টিপ্পেরা, প্রিন্টেড এট দি পাইওনিয়ার্স প্রেস এলাহাবাদ, পৃষ্ঠা ২৮-২৯]

 

সুন্নি মতবাদ কী

সুন্নি আরবি সুন্না শব্দের সম্বন্ধবাচক বিশেষ্য। সুন্না অর্থ পদ্ধতি, রীতি, প্রথা, বিধান, আচরণ ইত্যাদি। সাহাবিগণ হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর বাণী, কর্ম ও নির্দেশাদি পূর্ণরূপে অনুসরণ করেছেন বলে তাঁদের উক্তি, কাজ এবং নির্দেশাদিও সুন্নাহর অন্তর্ভুক্ত। মহানবী (সা.) ও সাহাবিদের সুন্নাহর অনুসারীগণই সুন্নি। বাংলাদেশে অধিকাংশ মুসলমান সুন্নি। সুন্নি (আহলে সুন্নাহ ওয়া’ল-জমা’আ:) নামটির উদ্ভব হয় ‘আববাসী খলিফা আল-মুতাওয়াক্কিলের আমলে (২৩২-৪৭ হি.)। খলিফা আল-মুতাওয়াক্কিল নিজে সুন্নি ছিলেন। তাঁকে ‘মুহয়ুস-সুন্না’: (সুন্নাহর পুনরুজ্জীবন সাধনকারী) খেতাবে ভূষিত করা হয়েছিল। পরে সুন্নি দলটি খলিফা ও বাদশাহগণের পৃষ্ঠপোষকতা লাভ করেছে। সুন্নি আকীদা ও মতবাদের ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণে বিশেষ অবদান রেখেছেন আবুল-হাসান আল আশ’আরী (মৃ. হি. ৩২৪) ও আবূমানসূর আল-মাতুরীদী (মৃ. হি. ৩৩৩)। [বাংলাপিডিয়া – বাংলাদেশের জাতীয় জ্ঞানকোষ।]

 

বাংলা বিজয় ও সুফিবাদের আবির্ভাব

১২০৪-৫ খ্রিস্টাব্দে বখতিয়ার খিলজি কর্তৃক বাংলা বিজিত হলে ইসলামের শরীআত ও মারিফত উভয় ধারার প্রচার ও প্রসার তীব্রতর হয়। শাসকশ্রেণির সঙ্গে বহু পীর-দরবেশ এদেশে আগমন করে ইসলাম প্রচারে মনোনিবেশ করেন। মুসলিম বিজয়োত্তর যে কয়জন সুফি-দরবেশ ইসলাম ও সুফিবাদ প্রচারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন, তাঁদের মধ্যে শেখ জালালুদ্দীন তাব্রিজি (র.), শাহ জালাল (র.), শেখ আলাউল হক (র.), খান জাহান আলী (র.), শরফুদ্দীন আবু তাওয়ামা (র.), শাহ ফরিদউদ্দীন (র.) প্রমুখ উল্লেখযোগ্য। এঁরা সুফিবাদের আধ্যাত্মিক তত্ত¡ চমৎকারভাবে তুলে ধরে সাধারণ মানুষকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করেন, ফলে বঙ্গের বিভিন্ন অঞ্চলে এই মতবাদ প্রসার লাভ করে।

 

চট্টগ্রাম দিয়ে ইসলামের আবির্ভাব

তৎকালে বৌদ্ধ পাল সাম্রাজ্য আরব আব্বাসিদ খিলাফতের সাথে সম্পর্ক স্থাপন করেছিল। পাল রাজত্বকালে ইসলাম প্রথম বাংলায় আত্মপ্রকাশ করে চট্টগ্রাম বন্দরের মতো জায়গাগুলোতে প্রাথমিক আরব মুসলিম বণিকদের সাথে বাণিজ্য বাড়ার ফলস্বরূপ। এই প্রমাণ থেকে বোঝা যায় যে তুর্কি বিজয়ের অনেক আগে থেকেই আরব ব্যবসায়ীরা বঙ্গোপসাগরে এসেছিল। দক্ষিণ এশিয়ার প্রাচীনতম মসজিদটি সম্ভবত লালমনিরহাটে রয়েছে, যা হযরত মুহাম্মদের জীবদ্দশায় বা তার ঠিক পরে নির্মিত হয়েছিল। বাণিজ্য ছাড়াও, বিজয়ের আগে মিশনারিদের হিজরতের মাধ্যমেও বাংলার মানুষের কাছে ইসলামের প্রচলন ছিল। প্রাচীনতম সুফি মিশনারিরা হলেন সৈয়দ শাহ সুরখুল আন্টিয়া এবং তার ছাত্ররা, বিশেষত শাহ সুলতান রুমী, যিনি ১০৫৩ খ্রিস্টাব্দে বাংলায় এসেছিলেন। রুমী বর্তমান নেত্রকোণা, ময়মনসিংহে স্থায়ী হন; যেখানে তিনি স্থানীয় শাসক এবং জনগণকে ইসলাম গ্রহণের জন্য প্রভাবিত করেছিলেন। ত্রয়োদশ শতাব্দীতে জেনারেল বখতিয়ার খিলজির বাহিনী দ্বারা বাংলার প্রথম মুসলিম বিজয় হয়েছিল। এটি আজ অবধি শত বছর ধরে এই অঞ্চলে মুসলিম প্রভাবের দ্বার উন্মুক্ত করেছিল। বাংলার অনেক মানুষ এই বিজয়ের পরে মিশনারিদের আগমন দিয়ে ইসলাম গ্রহণ শুরু করে। সুলতান বালখী এবং শাহ মখদুম রূপস উত্তর বাংলার বর্তমান রাজশাহী বিভাগে বসতি স্থাপন করেছিলেন এবং সেখানকার সম্প্রদায়গুলোতে ইসলাম প্রচার করেছিলেন। এই অঞ্চলে অসংখ্য ছোট সুলতানাতের উত্থান হয়েছিল। লখনৌতির সুলতান শামসুদ্দিন ফিরোজ শাহের শাসনামলে বর্তমান সাতগাঁও, সোনারগাঁ এবং ময়মনসিংহের বেশিরভাগ অংশ মুসলিম আধিপত্যে এসেছিল। বুরহানউদ্দিনের নেতৃত্বে ১৩টি মুসলিম পরিবারের একটি সম্প্রদায় উত্তর-পূর্ব শহর শ্রীহট্ট (সিলেট) শহরে বাস করত, তাদের বংশধর চট্টগ্রাম থেকে আগত বলে দাবি করেছে।

 

সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাসের

চট্টগ্রামে আগমন

সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস রাদিয়াল্লাহু আনহু ছিলেন মহানবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অন্যতম প্রধান সাহাবি। ১৭ বছর বয়সে তিনি ইসলাম গ্রহণ করে। তিনি ইসলাম গ্রহণকারীদের মধ্যে ১৭তম ব্যক্তি। ৬৩৬ সালে পারস্য বিজয়ের নেতৃত্ব ও শাসনের জন্য তিনি অধিক পরিচিত। ৬১৬ ও ৬৫১ সালে তাকে ক‚টনৈতিক দায়িত্ব দিয়ে চীন পাঠানো হয়েছিল। ধারণা করা হয় চীনে যাওয়ার সময় নৌ রুটে তিনি চট্টগ্রাম বন্দরে থেমেছেন এবং বাংলাকে ইসলামের সাথে পরিচয় করানোয় তার অবদান আছে। ধারণা করা হয়, ৬৪৮ খ্রিস্টাব্দে তিনি বাংলাদেশের লালমনিরহাটে একটি মসজিদ নির্মাণ করেন, যা স্থানীয়ভাবে আবু আক্কাস মসজিদ নামে পরিচিত। চীনা মুসলিমদের মতে, চীনের ক্যান্টন বন্দরে তার কবর আছে। অবশ্য আরবদের মতে, তার কবর আরবে অবস্থিত। [উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে]

 

ইসলাম নিম্নলিখিত তিনটি উপায়ে

বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে

১. চীন, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া এবং ইন্দোনেশিয়াসহ পূর্ব অঞ্চলে প্রবেশের অন্যতম প্রধান বন্দর ছিল চট্টগ্রাম বন্দর। অনেক বণিক চট্টগ্রাম বন্দরে নোঙর করতেন এবং স্থলপথ ব্যবহার করে চীনে যেতেন। আরব বণিকরা পূর্ব-ইসলামিক আমল থেকেই এই বন্দরটি ব্যবহার করে আসছিল এবং তারা ইসলাম গ্রহণের পরেও তা অব্যাহত রেখেছিল। তারা তাদের ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডের সাথে ইসলাম প্রচার করত। ইসলাম সেই সময় থেকেই ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে।

২. তামিলনাড়– উপক‚লীয় রাজ্যের রাজা চেরুমল পেরুমল হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবদ্দশায় ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। ফলস্বরূপ অঞ্চলটি ইসলাম প্রচারের একটি কেন্দ্রে পরিণত হয়েছিল। প্রচারকরা সেই অঞ্চল থেকে বাংলাদেশে আসতেন।

৩. মুহাম্মদ বিন কাশেম কর্তৃক সিন্ধু বিজয়ের পরে অনেক প্রচারক আরব, ইরান, ইরাক, তুরস্ক থেকে পায়ে হেঁটে আসতেন এখানে ইসলাম প্রচারের জন্য।

 

ইসলাম প্রচারের ঐতিহাসিক দলিল

ছয় শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে ইসলামের নীরব প্রচার ঐতিহাসিকদের প্রমাণের অভাবে লুকিয়ে ছিল। আধুনিক গবেষকরা আরব মুসলিম ঐতিহাসিক, ভূগোলবিদ ও মুহাদ্দিসিসের লেখা বই থেকে এর প্রমাণ পাওয়া যায়। উদাহরণস্বরূপ, মুহাদ্দিস ইমাম আবদনা মারওয়াজীর বর্ণনা থেকে প্রমাণিত হয়, আবু ওক্কাস ইবনে ওহাইব সহ সাহাবিদের একটি দল ৬১৮ সালে চট্টগ্রামে এসেছিল। আবুল কাসেম ওবায়দুল্লাহ ইবদ খুরদাদ্বিহ, আল মাসুদি, ইয়াকুব ইবনে আবদুল্লাহ আল ইদ্রিসিসহ একাদশ শতাব্দীর বহু আরব ভৌগোলিকের বিবরণ অনুযায়ী চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর, চাঁদপুর নদীবন্দর, রামু, কক্সবাজার ইত্যাদিতে আরব বণিকদের ব্যবসায়িক সম্পর্ক এবং বন্দোবস্তের কথা উল্লেখ করেছেন যা সম্প্রতি আবিষ্কৃত প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ দ্বারা যাচাই করা হয়েছে। রাজশাহীর পাহাড়পুরে হারুন-উর-রশিদ (৭৮৮)-এর একটি সোনার মুদ্রা পাওয়া গেছে, কুমিল্লার ময়নামতিতেও আব্বাসীয় আমলের আরও একটি মুদ্রা পাওয়া গেছে। সপ্তম শতাব্দীতে (৬৮৯ বিসি, ৬৯ হিজরি) নির্মিত একটি প্রাচীন মসজিদ সম্প্রতি লালমনিরহাট জেলায় আবিষ্কৃত হয়েছে।

বাংলা বিজয়ের আগে ইসলাম

প্রচারের ধারাবাহিক বিবরণ

বঙ্গ বিজয় শুরু হয় ১২০৪ সালে। এই ভূমির লোকেরা বাংলা বিজয়ের আগে ইসলামের সাথে পরিচিত ছিল। ইসলাম-পূর্বকাল থেকেই আরব বণিকদের চট্টগ্রাম বন্দরের সাথে যোগাযোগ ছিল। সাম্প্রতিক গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে, হযরত মুহাম্মদ (সা.) – এর জীবদ্দশায় আবু ওক্কাস মালিক, কুইজ ইবনে সাইরাাদি, তামিম আনসারী, উরাহ ইবনে আসসা, আবু কুইজ ইবনে হারিসা সহ একাধিক সাহাবি চট্টগ্রামে এসেছিলেন। তারা সেখানে কয়েক বছর ইসলাম প্রচার করেছিলেন। তারপর চীনে চলে যান। নিম্নবর্ণিত সাহাবিগণ হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর ইন্তেকালের পর চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর দিয়ে বাংলাদেশে এসেছিলেন- আবদুল্লাহ ইবনে উতবান, আসেম ইবনে আমর তামিমি, সাহেল ইবনে আবদী, সুহেল ইবনে আদি, হাকিম ইবনে আবেল আসসাকাফি প্রমুখ। পরে মুহাম্মদ মামুন ও মুহাম্মদ মোহামেইনের একটি দল সহ তাবেয়ীদের পাঁচটি প্রতিনিধি দল এখানে ইসলাম প্রচার করতে এসেছিল। ৭১২ সালে মুহাম্মদ বিন কাসেম সিন্ধু জয় করেছিলেন। এটি মুসলমানদের বাংলায় আসার পথ প্রশস্ত করেছিল।

 

মুসলমানদের চট্টগ্রাম ও আরাকানে

বসতি স্থাপনের ইতিহাস

৭৭৮ সালে একদল মুসলমান বঙ্গোপসাগরে ঝড়ের কবলে পড়ে। তাদের আরাকানের রাজা মা-বা-টিংয়ের কাছে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। রাজা তাদের আচরণ এবং বুদ্ধি দ্বারা তাদের ওপর খুব সন্তুষ্ট হন। তিনি তাদের বসতি স্থাপনের জন্য কয়েকটি গ্রাম দিয়েছিলেন। ফলস্বরূপ, সময়ের সাথে সাথে একটি ইসলামি সমাজের বিকাশ ঘটে।

 

বায়েজিদ বোস্তামির চট্টগ্রামে আগমন

৮৬৬ থেকে ৮৭৪-এর মধ্যে ইরানের বিখ্যাত সাধক বায়েজিদ বোস্তামি চট্টগ্রামে ইসলাম প্রচার করেছিলেন। যদিও বেশিরভাগ ঐতিহাসিক বলেছেন, তিনি তাঁর স্বদেশে ফিরে এসেছিলেন, তবে অনেক লোক বিশ্বাস করেন যে তিনি মারা গেছেন এবং তাকে চট্টগ্রামে সমাধিস্থ করা হয়েছিল। তাঁর মাজারটি এখনও চট্টগ্রামে রয়েছে।

 

আরাকানি মুসলিম ও তাদের প্রভাব

৯৫৪ সালে আরাকানের মুসলমানরা এত শক্তিশালী হয়ে উঠল যে তারা চট্টগ্রামের একাংশে মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠা করেছিল। রাজা সান-দা-ই মুসলিম শাসন সহ্য করতে না পেরে তাদের পরাজিত করেছিলেন।

শাহ মুহাম্মদ সুলতান বালখী

১০৫৩ সালে শাহ মুহাম্মদ সুলতান বালখী নদীপথে মানিকগঞ্জের হরিরামপুরে পৌঁছেছিলেন। পরে তিনি বগুড়ার মহাস্থানগড়ের আশপাশে একটি ইসলাম প্রচার কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি মসজিদ এবং ইসলামি স্কুল প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। এই সময় তাকে মহাস্থানগড়ের রাজা পরশুরামের সাথে যুদ্ধ করতে হয়েছিল। যুদ্ধে রাজা নিহত হন। পরে সেনাপ্রধান সুরখাব ও বন্দি রাজকুমারী রত্না মনি ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। শাহ মুহাম্মদ সুলতান বালখী তাদের বিয়ের ব্যবস্থা করেছিলেন এবং সুরখাবকে নতুন রাজা হিসেবে মনোনীত করেছিলেন।

 

শাহ মুহাম্মদ সুলতান রুমী

১০৫৩ সালে শাহ মুহাম্মদ সুলতান রুমী একদল প্রচারক নিয়ে নেত্রকোণায় এসেছিলেন। তিনি মদনপুরের রাজাকে ইসলাম গ্রহণের জন্য আমন্ত্রণ জানান। রাজা প্রথমে প্রত্যাখ্যান করলেন কিন্তু পরে আমন্ত্রণটি গ্রহণ করে ইসলামে প্রবেশ করেন।

 

বাবা শাহ আদম

১১৭৯ সালে বাবা শাহ আদম একদল প্রচারক নিয়ে বিক্রমপুরে ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যে এসেছিলেন। পরে রাজা বল্লাল সেনের সাথে যুদ্ধে তিনি শহীদ হন।

 

শাহ মখদুম রূপোশ

১১৮৪ সালে শাহ মখদুম রূপোশ প্রথম ইসলাম প্রচারক হিসেবে রাজশাহীতে এসেছিলেন। তিনি এমন এক প্রচারক যিনি সম্পূর্ণ প্রতিক‚ল পরিবেশে বাংলাদেশে ইসলামের ভিত্তি তৈরি করেছিলেন। তিনি রাজশাহীকে ইসলামি লোকালয়ে পরিণত করেছিলেন। তাঁর কার্যক্রম রামপুর ও বোয়ালিয়াকেন্দ্রিক ছিল।

 

ইসলাম বিভিন্ন স্থানে বিজয়ী

বাংলায় সম্পূর্ণ মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠায় দুই শতাব্দী লেগেছিল। মুসলিম শাসন রাজশাহী থেকে শুরু হয়ে খান জাহান আলীর দ্বারা খুলনায় সম্পন্ন হয়। ১. উত্তরবঙ্গ (নদীয়া, গৌড়, রংপুর, দিনাজপুর: ১২০৪); ২. পূর্ব-দক্ষিণাঞ্চল (সোনারগাঁ, ঢাকা, ফরিদপুর, ময়মনসিংহ, বরিশাল: (১২৭৪-১২৯০); ৩. সিলেট (১৩০৩); ৪. খুলনা বিভাগ (১৪১৮-১৪৪৯); ৫. চট্টগ্রামে (১৩৪০)। ইসলাম প্রচার : যদিও ইসলাম অনেক আগে চট্টগ্রামে পৌঁছেছিল, সেখানে মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠায় সময় লেগেছিল। সুলতান ফখরুদ্দিন মোবারক শাহ ১৩৩৮ সালে সোনারগাঁয়ে ক্ষমতা দখল করেন এবং শাসনের ক্ষেত্রটি দক্ষিণ-পূর্বদিকে প্রসারিত করেছিলেন। এই সময়কালে আলী কাদের খান, আলী মোবারক খান এবং শামসুদ্দিন মোবারক শাহ উত্তরবঙ্গে ক্ষমতায় ছিলেন। ফখরুদ্দিন মোবারক শাহ ১৩৪০ সালে প্রথমবারের মতো চট্টগ্রামকে মুসলিম শাসনের অধীনে নিয়ে আসেন এবং চাঁদপুর থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত একটি রাস্তা তৈরি করেন।

 

উপসংহার

আরব সমুদ্র বণিকদের জন্যেই আমরা আজ সুন্নি মুসলমান। স্থল ও জল উভয় পথেই ইসলাম বাংলায় প্রবেশ করেছিল। স্থলভাগে তুর্কি বিজয়ীরা বখতিয়ারের আগ্রাসনের সময় বাংলায় ইসলাম নিয়ে এসেছিলেন। জলপথ দিয়ে ইসলাম ধর্ম নিয়ে বাংলায় এসেছিল আরব ব্যবসায়ীরা। প্রথম দিকের আরব মুসলমানরা বাংলাসহ ভারতীয় উপমহাদেশের উপক‚লীয় অঞ্চলে সমুদ্রপথে বাণিজ্যিক যোগাযোগ স্থাপন করেছিল। প্রথম থেকেই আরব মুসলিমরা বেশিরভাগ আরব ভূমি মরুভূমি হওয়ায় এবং আরব উপদ্বীপে কৃষিক্ষেত্রের অভাবে চট্টগ্রাম অঞ্চলে এসে নদী নালা শস্য শ্যামল বাংলা দেখে অভিভূত হয়ে পড়েছিল। আরবরা ছিল তৎকালীন বিশ্বের সবার আগে সমুদ্রযাত্রা এবং সামুদ্রিক বণিক। তারা পূর্ব এশীয় দেশ এবং পশ্চিম ইউরোপীয় দেশগুলোর মধ্যে ব্যাপক সমুদ্র বাণিজ্য চালিয়েছিল। ভৌগোলিক অধ্যয়ন থেকে এ বিষয়টি পুরোপুরি স্পষ্ট যে, ইসলামের আবির্ভাবের আগেও আরব অঞ্চলগুলো ভূমধ্যসাগর, লোহিত সাগর এবং পারস্য উপসাগরের সমুদ্রপথগুলোর মধ্য দিয়ে পূর্ব এবং পশ্চিমের বাণিজ্যের মধ্যে একটি সেতু হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। ইসলামের আবির্ভাবের পরে আরব মুসলিমরা প্রশান্ত মহাসাগর পর্যন্ত আরব সাগর, ভারত মহাসাগরসহ এই সমুদ্রপথের ওপর নিখুঁত নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছিল। পশ্চিম ভূমধ্যসাগর একটি মুসলিম হ্রদে পরিণত হয়ে দশম শতাব্দীতে সমুদ্রের বাণিজ্য রুটের ওপর আরব আধিপত্য বাস্তবে পরিণত হয়েছিল। ভারতীয় উপমহাদেশ এবং শ্রীলঙ্কার পশ্চিম ও দক্ষিণ উপক‚ল আরব ব্যবসায়ীদের প্রধান বসতি ছিল, একইসাথে দক্ষিণ চীন সাগর এবং ফিলিপাইনের দ্বীপপুঞ্জে বিস্তৃত ছিল। প্রকৃতপক্ষে এতটা প্রভাবশালী ও বিস্তৃত আরব ব্যবসায়ীদের এই বাণিজ্যপথের নিয়ন্ত্রণ ছিল যে, ইউরোপীয়রা কীভাবে নিজেদের জন্য লাভজনক রুট তৈরি করতে পারে, সে চেষ্টা করে হতাশ হয়ে পড়েছিল।

লেখক: খণ্ডকালীন প্রভাষক, আর্মি ইনস্টিটিউট অব বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন, সাভার

স্বদেশ খবর/

You may also like

মন্তব্য করুন